February 20, 2020, 10:26 am

১৯৭১ এর মুক্তি যুদ্ধের রণক্ষেত্র কামালপুর।

*বিজয়ের মাস*

নিজস্ব প্রতিনিধিঃ

এই যুদ্ধ চলাকালেই ধানুয়াকামালপুর গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা মতিউর রহমান (বীর প্রতীক) ও নূর ইসলাম (বীর প্রতীক) গুলি বৃদ্ধ হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করেন এবং কামালপুর মির্জাপাড়া মোড়ে গুলি বৃদ্ধ হয়ে সেক্টর কমান্ডার কর্নেল তাহের পা হারান। উভয় পক্ষের ক্রমাগত আক্রমন চলাকালে মুক্তিযোদ্ধারা সু-কৌশলে হানাদার বাহিনীর সদর দপ্তরের সাথে কামালপুর ক্যাম্পের সব ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন করে দেয়।
১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ১১ নং সেক্টরে কামালপুর নামটি মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে খুবই পরিচিত ও স্মরনীয়। জামালপুর জেলার গাঢ় পাহাড়ের পাদদেশে সীমান্তবর্তী উপজেলা বকশীগঞ্জ। এই উপজেলা কামালপুর এলাকাটি মহান মুক্তিযোদ্ধের ইতিহাসে ঐতিহাসিক উত্তর রনাঙ্গনের ১১ নং সেক্টর হিসেবে খ্যাত। ভারতের মেঘালয়ের রাজ্যে মহেন্দ্রগঞ্জ থানা খুব কাছাকাছি কামালপুর সীমান্ত। ভৌগলিক কারণে মুক্তিযোদ্ধে এই এলাকার গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। কামালপুরে ছিল ই.পি.আর (বর্তমানে বি.ডি.আর) ক্যাম্প।
ুমুক্তিযুদ্ধে কামালপুর ক্যাম্পই ছিল পাক হানাদার বাহিনীর অন্যতম দুর্ভেদ্য ঘাঁটি। একারণেই সমর বিশেষজ্ঞ কর্নেল তাহের ১১নং সেক্টরকে ভারতের মানকারচর পুরা কাশিয়া, ডালু এবং বাঘমারা ভিত্তিক চারটি সাব সেক্টরে বিভক্ত করে। কামালপুর ক্যাম্পের মুখোমুখি মহেন্দ্রগঞ্জকে ১১নং সেক্টরের হেড কোয়াটার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। য্দ্ধুকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য এডভোকেট আশ্রাফ হেসেন, এডভোকেট সরাফত আলী, সোলাইমান হক, আশেক মাহমুদ কলেজের সাবেক ভি.পি আব্দুল মতিন মিয়া হিরু, ফজলুল করিম খোকা, এম.এন. এ আলহাজ আব্দুস সামাদ, ফজলুল বারী তারা, রিয়াজুল হক, ফজলুল হক সহ নেতাদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে সংগ্রাম পরিষদ। যুদ্ধের প্রথম দিকে ১১নং সেক্টরে দায়িত্বে ছিলেন মেজর জিয়াউর রহমান (পরে প্রেসিডেন্ট) জুলাই মাসে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টর প্রথম, তৃতীয় ও অষ্টম বেটালিয়ান নিয়ে তাঁর পরিচালনা জেড ফোর্স গঠিত হয়। ১৫ আগষ্ট পাকিস্তান থেকে পালিয়ে আসা এবং আমেরিকা থেকে ট্রেনিং প্রাপ্ত সু-দক্ষ রণ কৌশলী মেজর আবু তাহের সেক্টর কমান্ডারের দায়িত্ব প্রাপ্ত হন। এর পর বীর সেনানী ক্যাপটেন্ট সালাউদ্দিন, মমতাজ বীর উত্তম, ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টর ক্যাপ্টেন্ট হাফিজ, লেফটেনেন্ট আব্দুল মান্নান, মেজর আব্দুল আজীজ, ফ্লাইট লেফটেনেন্ট হামিদুল্লা খান, নায়েক সুবেদার সিরাজ, ও গোয়েন্দা বিভাগের মনিরুজ্জামান ১১নং সেক্টরে যোগদান করেন। মান্নান এবং হামিদুল্লাহ খান সাব সেক্টরগুলো নিয়ন্ত্রণ করতেন। তাহেরের পরিকল্পনা অনুসরণ করেই মুক্তিযোদ্ধারা সর্বপ্রথম কামালপুর দুর্গটি আক্রমন করেন। এই প্রেক্ষাপটেই ৭১ সালের ৩১শে জুলাই এক রক্তক্ষয়ী সম্মুখ যুদ্ধে ক্যাপঃ সালাউদ্দিন সহ বাংলার ৬৬ জন বীর সন্তান দেশের মাটি ও মানুষের জন্য বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে শহিদ হয়েছেন। তাঁদের আতœত্যাগের বিনিময়েই আজকের বাংলাদেশ।
এই দিন গভীর রাতে ধানুয়া কামালপুর রণাঙ্গণে সম্মুখ যুদ্ধে দুর্ধর্ষ আক্রমনে প্রস্ততি শেষ।
ধানুয়া কামালপুর গোডাউনে পৌঁছার মাত্র শত্রæরা তাকে টার্গেট করে ব্রাশ ফায়ার শুরু করলে ক্যাপঃ সালাউদ্দিন মমতাজের বুক শত্রæ পক্ষের গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যায়। ঐদিনের ঐতিহাসিক সম্মুখ যুদ্ধের তিনি ছাড়াও নায়েক আব্দুস সালাম, লেঃ নায়েকঃ গোলাম মোস্তফা, লেঃ নায়েক সিরাজুল ইসলাম, সিপাহী মোহাম্মদ আলী, রহিদ আলী, আমিনুল ইসলাম, আঃ লতিফ, রবিউল ইসলাম, রফিকুল ইসলাম, ওয়াবাহ আলী, সদর উদ্দিন, হায়েত আলী, কুদ্দুস, আঃ আলম,শাহজাহান, মঞ্জুর আলী, আনোয়ার হোসেন ও সোবহান সহ ৬৬ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। রক্তে রঞ্জিত হয় কামালপুরের মাটি।
একই দিনের যুদ্ধে খতম হয় শত্রæ পক্ষের ৭০ জন। মূলত এখানে ১২ই জুন থেকে ৩০শে নভেম্বর পর্যন্ত ৮ বার সম্মুখ যুদ্ধ হয়। এসব যুদ্ধে হানাদার বাহিনীর পাল্টা আক্রমণে কামালপুরের মাটিতেই আসাদুজ্জামান, তছলিম উদ্দিন ও মির্জা কাদের সহ ১৯৭ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন।
এই রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের সময় পর্যায়ক্রমে হানাদার বাহিনীর কুখ্যাত মেজর আয়ুব খান সহ ৫৮৭ জন পাক সেনা নিহত হয়। ১১নং সেক্টরের এই ভয়াবহ যুদ্ধের খবর সে সময় সাংবাদিক হারুন হীবের পরিবেশনায় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে নিয়মিত প্রচারিত হয়ে ছিল।
৪ই ডিসেম্বর বকশীগঞ্জে অল্প সংখ্যক পাক সেনা ক্যাম্প পাহাড়ায় নিয়োজিত থাকে। কামালপুরকে শত্রæ মুক্ত করে ১১নং সেক্টরে মুক্তিযোদ্ধারা বকশীগঞ্জকে হানাদার ম্ক্তু করার জন্য চার দিক থেকে ঘিরে ফেলে। ৫ ডিসেম্বর রাত ১টার পর থেকে বকশীগঞ্জের চারটি ক্যাম্পের অবস্থানরত পাক সেনারা পালিয়ে যায়। ৬ ডিসেম্বর শত্রæমুক্ত হয় বকশীগঞ্জ। ৯ মাসের স্বাধীনতার যুদ্ধে ১১নং সেক্টরে গুরুত্ব পূর্ণ অবদানের জন্য মেজর মাইনুল হোসেন চৌধুরী বীর বিক্রম, ক্যাপঃ সালাউদ্দিন বীর উত্তম, ক্যাপঃ হাফিজ উদ্দিন বীর বিক্রম, লেঃ আঃ মান্নান বীর বিক্রম, সিপাহী মতিউর রহমান বীর বিক্রম, সিপাহী আঃ আজিজ বীর বিক্রম, সিপাহী গোলাম মোস্তফা বীর বিক্রম, লেন্স নায়েক তাজুল ইসলাম বীর প্রতীক, সিপাহী শফিউদ্দিন বীর প্রতীক, মতিউর রহমান বীর প্রতীক ও জহুরুল হক মুন্সী বীর প্রতীক বার সহ ২৯জন বীর যোদ্ধাকে রাষ্ট্রীয় বাবে খেতাবে ভূষিত করা হয়।
১১নং সেক্টরে যে সব মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হয়েছেন তাঁদের অমর স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্য কামালপুর ক্যাম্পে নির্মিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভ।

শেয়ার করুন........

এই বিভাগের আরো খবর